পূজা-প্রজন্ম-প্রীতি-সম্প্রীতি
বেবী রাণী কর্মকার
Published in community magazine, Sharodya 17th issue, for Puza festival 2012, Tokyo
টোকিওর ছুটির দিনগুলো
যেন বৃষ্টিতে ভিজবেই । অন্ততঃ শনিবার সকাল । যদিও এখানে বর্ষা নামে কোন ঋতু নেই,
আছে গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্ত, অথচ পুরো আকাশটাকে আকড়ে ধরে যখন কালো বর্ষা নামে
তখন তাকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কথা ও সুরে ‘আষাঢ় কোথা হতে আজ পেলি
সাড়া’ কিংবা ‘শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে’ ঘরানায় ফেলে দেয়া যায় । আর জুলাইয়ের প্রথম দিকে সোনালী
খোলস ছেড়ে উড়েছিল যে ঝিঁঝিঁ পোকার মত জাপানী এক ধরনের পোকা সিকাডা, আগস্টের শেষে
তারা শরতে ঝরা শিউলীর মত পথের পাশে পড়ে থাকল । পুরো গ্রীষ্মকালটাকে সুর ও ছন্দ
মুখর করে রেখেছিল প্রায় । বনওদোরী উৎসবের তাইকো ড্রাম, জাপানীজ ল্যান্ট্রান ‘চোচিন’ আর উদ্দাম সিকাডা
পতঙ্গের সকাল-সন্ধ্যা ‘লাভ-কল’ এর কোরাস, সব অলি-গলি গ্রীষ্মকালে উৎসব মুখর করে এখন
বিদায় ।
এখন শরৎ । শিউলী না
থাকলেও ক্যামেলিয়ার কচি রঙীন পাতারা উন্মুখ; অন্যদিকে টোকিওর রাস্তার দু’পাশে সারি সারি গিন্কো গাছের পাতারা বলছে যাই যাই ।
সামনে দুর্গোৎসব । উৎসব শব্দটা লিখতে গিয়ে কলমটা একটু গতিহীন হল । উৎসব মানেই থরে
থরে সাজানো আয়োজন । পাল বাড়িতে প্রতিমার খড়ের কাঠামোয় পরতে পরতে মাটির প্রলেপ, ঘোষ
বাড়িতে লাড্ডু, চমচম, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে মহিষাসুরমর্দিনীর ‘দুষ্টের দমন সৃষ্টের পালন’
কন্সেপ্ট নিয়ে নবধারার গীত, নৃত্য, নাট্য কিংবা সবগুলোর মিলিত গীতনৃত্যনাট্য ।
ফ্যাশন হাউজেও দশভুজা; আতশবাজির ফুলকিতে নতুন মাত্রা; হালখাতার জন্য নতুন খাতা;
সবশেষে প্রতিমা শিল্পী স্নান করে নতুন কাপড় পরে প্রার্থনা করে পূর্বপুরুষদের
আশীর্বাদ চেয়ে চোখ আঁকবেন । দেবী মহামায়া নয়ন মেলবেন । অতঃপর পূজার সূচনা ।
প্রবাসের পূজার আয়োজনটা
কিছুটা সংক্ষিপ্ত । মহালয়া, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, কুমারী পূজা, সন্ধিপূজা, নবমী,
দশমী, বিসর্জন – পুরো পূজাটাকে সংক্ষিপ্ত করে
প্রবাসের দুর্গাপূজা । কারণ, গতি, ব্যস্ততা । পৃথিবীর এক বড় জনগোষ্ঠী সংক্ষিপ্ত
কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অভিবাসনের রথে চড়ে বসেছে । আর ঘন ঘন নিবাস পরিবর্তনে সবচেয়ে যে
জায়গাটাতে টানাপোড়েন চলে তাহলো ইমোশনাল অ্যাটাচ্মেন্ট । প্রয়োজন বনাম আবেগে
দ্বিতীয়টার প্রতি উদাসীনতা এখন গ্রহণযোগ্য ।
মেলবোর্নের দুর্গাপূজার
কথাই বলি । ২০০6-এর কথা । পুরোহিত এলেন নিউজিল্যাণ্ড থেকে । তথ্য-প্রযুক্তির
পরামর্শদাতা । প্রৌঢ় ভদ্রলোক সস্ত্রীক এসে পূজা করলেন । ফিরে যাবার আগে একটা বিয়ে
পড়ালেন । বাংলাদেশী বর-কনে অষ্ট্রেলিয়ায় লেখাপড়া করছে । বিয়েতে প্রবাসীরা দু’দলে ভাগ হয়ে কনে পক্ষ আর বর পক্ষ সেজে গেট ধরলেন ।
কৌতুকময় দর কষাকষিও হল । সবার বাড়ি থেকে খাবার এল । ওয়ান-ডিস পার্টির মত ৩০-৩৫ রকম
খাবার দিয়ে বিবাহ-ভোজ সম্পন্ন হল ।
প্রবাসের বিস্ময়কর
অভিজ্ঞতা হল কমিউনিটি স্ট্রেনথ; আর কমিউনিটি সেন্টার হল অনেকটা বহু
গৃহস্তের এক বাড়ির মত । বর-কনে দু’জনেই ভালোবাসায়
আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলল । অগ্নি সাক্ষী করে সাত পাকে বাঁধার ব্যবস্থা হল । তার ধোয়ায় কমিউনিটি সেন্টারের ফায়ার এলার্ম না
বেজে ওঠে সে ভয়ে এক ভদ্রলোক একটা টুলে দাঁড়িয়ে অনবরত হাওয়া দিয়ে এলার্মের কাছ থেকে
ধোয়া সরিয়ে দিচ্ছিলেন ।
উৎসবের আয়োজন নিয়ে এত
কথা এল । আর যেকোন উৎসবই কমিউনিটির শক্তি, সম্পদ, মনোভাবের প্রতিফলন । আর বন্ধন,
প্রীতি – এর ক্ষমতা অসীম ।
উৎসব মানেই আলো, সে
আলোয় আলোকময় ঘর-বারান্দা, ছাদ, প্রতিবেশীর আঙ্গিনা, খেলার মাঠ । ক্যাসেট প্লেয়ারে
মহালয়া বনাম রূপালী পর্দার সুপার হিট । আতসবাজির ফুলকি, দরজী বাড়ি থেকে পাঠানো
জামায় চিক্মিক্ জারদৌসি চুম্কি।
অথচ প্রবাসে বড় হয়ে ওঠা
এ প্রজন্মের কাছে উৎসবের বহুমাত্রিক কোরাসটা অনুপস্থিত; বরং তাদেরকে অনেকটা দর্শক
শ্রেণীতে বসিয়ে রাখা হয়েছে – তোমার জন্য আছে সাজানো
চেয়ার, বসে থাকো, বসে বসে তোমার বাবা-কাকা আর তাঁদের প্রজন্মের উৎসবের স্বাদ
কল্পনায় আস্বাদন কর । দেশ হত কিনে আনা পাঞ্জাবী-পাজামা পড়ে বাঙালী ম্যানিকিন
বানিয়ে এ প্রজন্মকে দর্শকের ভূমিকাটি ধরিয়ে দেয়া যেন ।
প্রশংসনীয় গ্রহণ ক্ষমতা
অথবা তাৎক্ষণিক নির্লিপ্ততা কিংবা নন-জাজমেন্টালিজম্ মনোভাবের কারণে এ
প্রজন্মের সামনে অনেক সময়ই বাবা-মায়েরা মনে করেন সবকিছু ঠিকঠাক মতই হয়তো গেলানো
গেল; কিন্তু গলাধঃকরণের পর উগ্রানোর আশঙ্কাটা তাঁরা চিন্তা করেন না ।
জীবন আর ফ্যান্টাসীর
সীমানাবিহীন উচ্চ প্রযুক্তির সংস্কৃতিতে বড় হয়ে ওঠা আমাদের সন্তানদের হাতে পঁচিশ
বছর আগে ফেলে আসা জগত ঘটা করে তুলে দেয়া হয়তো ততটা সহজ নয় । বাবা-মায়েরা অসম্ভব
কঠিন ব্রতে দু’দশক আগে ফিরে গিয়ে ৬৮
হাজার গ্রামের হাট-বাজারে ঘুরে সুগন্ধি আগরবাতি কিংবা আতর কেনেন, আর হ্যাজাকের
আলোয় পুরনো হালখাতায় পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচারণ করে সময়ের রোলার কোষ্টারে চড়ে চোখ বোজেন
। অতঃপর স্যুভেনির জীবনের ফ্রেম-এ প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে যেন বলতে চান, ‘ধরে রেখো, এখানে আছে
সম্পদ অমূল্য’ ।
যে জিনিসের ব্যবহার
যোগ্যতা নেই তার গ্রহণযোগ্যতা থাকাটা নেহাৎ স্যুভিনিরের মত ডিস্প্লে টেবিলে সাজিয়ে
রাখা নয় কি ?
সমগ্র বাংলাদেশী
সংস্কৃতি সত্ত্বাকে আষ্টে-পৃষ্ঠে আগলে রাখার জন্য এ প্রজন্মের কাছে আশাটা খুব বেশি
হয়ে যাচ্ছে নাতো ?
সে যাইহোক, দেশে কিংবা
প্রবাসে যে যেখানেই থাকুন, যেকোন উৎসব সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য প্রীতি-সম্প্রীতির
এক অনবদ্য নিউক্লিয়াস । ধর্ম, মত, দল নির্বিশেষে টোকিওতে অনেকগুলো বাঙালী সত্ত্বার
মাঝে কিছু সময়, মিষ্টিমুখ, আড্ডা, গানবাজনা, স্মৃতিচারণ, ক্যামেরায় এক দশভুজার
হাজার ফ্রেমে হাজার ক্লিক, দেশ হতে এয়ারলাইনসের বাধাধরা ওজন বাটখারায় মাপঝোপ শেষে
মাইগ্রেট করা কাসারীর কারুকার্যকময় রিকাবীতে নৈবেদ্যর মুকুট সাজাতে সাজাতে বৌদিদের
নীরব স্মৃতিচারণ, আরো নীরব অলক্ষ অশ্রু বিসর্জন ।
এসবের মধ্যে টোকিও তথা
প্রবাসে দুর্গাপূজায় নতুন করে আবার মনে করাঃ ধর্মটাকে গিরে আছে সংস্কৃতি, আর
সংস্কৃতিটা বাদ দিতে পারেনি কাউকে, কখনও, কোনদিনও; বরং মাটি, নদী, গাছপালা আর উদার
ধান ক্ষেতে এক ঝলক বাতাসে ৬৮ হাজার গ্রামের বাঁশিতে হাজার সুরে এক ঐক্যতান ।

